প্রত্যাবর্তন
আমি পৌঁছে গেছি
যেখানে কুয়াশায় চারিদিক দিক হারায়
আঠালো কুয়াশায় জড়িয়ে যেতে চাইছে আমার চোখের পাতা,
ছূঁচের মত বিঁধছে আমার চোখে বিদ্রোহী কুয়াশার সক্রোধ আক্রমণ
তাদের রাজত্বে আমি অনাহূত।
অসহায় দু'হাতে ঠান্ডায় দ্রবীভূত কুয়াশা সরানোর বৃথা চেষ্টা চালাতে লাগলাম আমি।
আমায় মিত্র বুঝেই হয়ত কুয়াশার সৈনিকেরা ধীরে পথ ছেড়ে সরে দাঁড়াল
অবারিত, তৃষ্ণার্ত দৃষ্টিতে চারিদিকের জগতটা শুষে নিতে থাকলাম।
পত্রবিহীন গাছের মাথায় কে যেন জড়িয়ে দিয়েছে পাঁজা পাঁজা কুয়াশার দূর্ভেদ্য জাল
বিরান পথের ধারে অটল সংকল্পে অপেক্ষমান দু'তিনটে শূণ্য মাটির ঘর
সর্বগ্রাসী কুয়াশার সাথে অনতিদীর্ঘ যুদ্ধে পরাহত।
কিসের আশায় অথবা কার জন্য আমার এ বিরান সর্পিল পথে হেঁটে চলা,
এ প্রশ্নের শত পুনরাবৃত্তিতেও কোন জবাব খুঁজে পেলাম না;
তাতে আমার চলায় বিন্দুমাত্র ব্যাঘাত ঘটল না।
যন্ত্রের মত চলতে থাকলাম দৃঢ় পায়ে, যেন চলতে আমি বাধ্য
গন্তব্য স্থির থাক আর না থাক।
টের পাচ্ছি খুব আস্তে আস্তে অসাঢ় হয়ে আসছে আমার সবকিছু
কুয়াশায় আর্দ্র হয়ে আসছে আমার মুখ, হাত-পা
শিরায় ধমনীতে অবিরাম বয়ে চলা রক্তের গতি ধীর হয়ে আসতে চাইছে
নিজের অজান্তেই ছুটে বেড়াচ্ছে চোখ কিসের খোঁজে
ফের ফিরে আসছে হতাশ ধূধূ পথে
দুই পা দূরেই কুয়াশায় যার অস্তিত্ব হারায়।
এমন অবিরাম চলায় হঠাত একটা ছোট্ট বিরতি
কুয়াশা কেটে দুচোখ পড়ল একটা কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে
সেখানে কিছু একটা গুটলি পাকিয়ে বেরসিক ভঙ্গিতে পড়ে আছে
নিঃশব্দ পায়ে এগিয়ে গেলাম আমি
তেমন কিছু না, একটা ছোট্ট পাখির বাচ্চা শুধু, কোন পাখি
তাও চিনলাম না-
রাতে বাসা থেকে পড়ে গিয়ে আর উঠতে পারেনি হয়ত
কুয়াশার শীতলতায় শ্বাসরুদ্ধ হয়ে তিলে তিলে প্রাণবায়ু বেরিয়ে গেছে
মুখটা খুব কাছে নিয়ে দেখতে লাগলাম মৃত বাচ্চাটাকে
তারপর নিষ্কম্প হাতে স্পর্শ করলাম ওর শিশির পড়া জমাট দেহ।
কি ঠান্ডা, কি অস্বাভাবিক ঠান্ডা সে স্পর্শ!
কেমন অপার্থিব এক শীতলতা
আমি অবিশ্বাস্য চোখে তাকিয়ে রইলাম নিজেরই হাতের দিকে।
এবং নিতান্ত নিষ্প্রয়োজনভাবে
আমার কুয়াশাভেজা গাল বেয়ে নিঃশব্দে নেমে এল দুফোঁটা অশ্রু
কেঁপে উঠল দুঁঠোট, আমি তা থামাবার কোন চেষ্টা করলাম না
আবারও নিঃশব্দ স্রোতে ভেসে গেল আমার মুখ, চিবুক বেয়ে চলে গেল বুকে
যেখানটা বহু আগেই বরফ হয়ে ছিল
আমি মোছার কোন চেষ্টা করলাম না,
যদি উষ্ণ অশ্রুপ্রবাহে গলে যায় বহুদিনের জমাট হিম।
আমার প্রত্যাশা পূরণে প্রবাহ অক্ষুন্ন রইল।
আমি খুঁজে পেয়েছি আমাকে
কুয়াশার দূর্বার মেঘ কেটে যাচ্ছে পথ থেকে,
মাটির ঘরগুলো যেন হঠাত ছাড়া পেয়ে বিস্মিত।
হাঁটু গেড়ে বসে আছি আমি
আমার তৃপ্ত দুহাতে মৃত্যুর শীতলতায় দ্রবীভূত মৃত পাখি।
~~~
লালমণিরহাট
২৭।১২।'০৪
সোমবার, ২৮ জুন, ২০১০
এতে সদস্যতা:
মন্তব্যগুলি পোস্ট করুন (Atom)
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন